সিনেমা আবিষ্কারের পর থেকে সিনেমার জগৎ প্রতি মুহূর্তেই প্রসারিত হয়েছে। সিনেমার মতো করে সিনেমা প্রেমিদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্নতা, কারোর পছন্দ একশন মুভি, কারোর বা জমজমাট প্রেমের রোমান্টিক মুভি, কারোর আবার ভয়ংকর ভয়ের ভৌতিক মুভি! তবে আমার মতো অনেকেই আছেন যাদের পছন্দ একটু ভিন্ন! ধুমধাম অ্যাকশন বা রোমান্টিক প্রেমের সিনেমার বিপরীতে আমাদের পছন্দ সার্ভাইভাল থ্রিলার কিংবা ক্রাইম থ্রিলার! যেখানে প্রতি মুহূর্তে থাকবে টানটান উত্তেজনা, জীবন মৃত্যুর মধ্যে ঝুলতে থাকা জীবন আর অসাধারণ সাহসিক কিছু চরিত্র!
চলুন বিগত সময়ে হলিউডে মুক্তি পাওয়া কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সার্ভাইভাল থ্রিলার সম্পর্কে জেনে আসি। যেগুলো আবসর সময়ে আপনার বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে।
‘Fall’ (2022)
'Fall' মুভিটি 2022 সালে মুক্তি পায় এবং এটি পরিচালনা করেছেন স্কট ম্যান। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভার্জিনিয়া গার্ডনার এবং গ্রেস ক্যারোলাইন কারি। গল্পটি শুরু হয় দুজন বন্ধুর জীবনের সবচেয়ে দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে। তারা দুজন একটি পরিত্যক্ত রেডিও টাওয়ারে আরোহণ করতে গিয়ে ভয়াবহ বিপদের মধ্যে পড়ে যায়। ২,০০০ ফুট উচ্চতায় তাদের বেঁচে থাকার জন্য কী কী সাহসিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সেই গল্পই এই সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু।
মুভিটিতে উচ্চতার দৃশ্য এবং চরিত্রের মানসিক চাপ খুব ভালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সিনেমার প্রতিটি মুহূর্তে আপনাকে জীবনের গুরুত্ব বোঝাবে, হার না মানার অনুপ্রেরণা যোগাবে।
IMDb rating: 6.4/10
‘Buried’ (2010)
'Buried' মুভিটি 2010 সালে মুক্তি পায় এবং এটি পরিচালনা করেছেন রদ্রিগো কোর্টেস। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন রায়ান রেনল্ডস। গল্পটি একটি মানুষের চারপাশে আবদ্ধ, যাকে জীবন্ত অবস্থায় কফিনের ভেতরে ঢুকিয়ে কবর দেয়া হয়। মুভিটি তার আতঙ্ক, বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা এবং সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চিত্র খুব ভালোভাবে তুলে ধরেছে। এই মুভিটির ক্লাস্ট্রোফোবিক সেট আপ, টানটান উত্তেজনা এবং রায়ান রেনল্ডসের অনবদ্য অভিনয় একে অনন্য করে তুলেছে। অল্প ক্যানভাসে কীভাবে একটি বড় গল্প বলা যায়, এই সিনেমা তার জীবন্ত উদাহরণ।
IMDb rating: 7.0/10
‘Everest’ (2015)
'Everest' মুভিটি 2015 সালে মুক্তি পায় এবং এটি পরিচালনা করেছেন বালতাসার করমাকুর। এটি একটি সত্য ঘটনার উপর ভিত্তি করে নির্মিত। সিনেমাটিতে 1996 সালের এভারেস্টে ঘটে যাওয়া একটি মারাত্মক ট্র্যাজেডির গল্প বর্ণনা করা হয়েছে। বালতাসার কোরমাকুর পরিচালনায় নির্মিত এই মুভিতে দেখানো হয়েছে কিভাবে একদল পর্বতারোহী এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহণের সময় একটি ভয়াবহ তুষারঝড়ের মুখোমুখি হয়। তাদের বেঁচে থাকার লড়াই, সাহস, এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা মুভিটিকে প্রানবন্ত করে তুলে। অভিনেতাদের দারুণ অভিনয় এবং প্রকৃত লোকেশনে শুটিং, এই মুভিকে বাস্তব অনুভূতি দিয়েছে। আবহাওয়া, বিপদ এবং পর্বতারোহণের চ্যালেঞ্জ আপনাকে এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যাবে। মুক্তির পর, 'Everest' মুভিটি সমালোচক এবং সাধারণ দর্শক মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। অনেকের মুভিটি শারীরিক এবং মানসিক সাহস কে নতুন করে অনুপ্রাণিত করেছে।
মানুষের ইচ্ছাশক্তি সীমাহীন। যত বড়ই চ্যালেঞ্জ আসুক, যদি আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তা থাকে, তাহলে সব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। পুরো গল্পের মাধ্যমে পরিচালক আমাদের এটিই বুঝানোর চেষ্টা করেছেন।
IMDb rating: 7.1/10
‘Adrift’ (2018)
'Adrift' মুভিটি 2018 সালে মুক্তি পায় এবং এটি পরিচালনা করেছেন বালতাসার কোরমাকুর। এটি একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা। গল্পটি এক দম্পতিকে নিয়ে, যারা প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে একটি ভয়ঙ্কর ঝড়ের কবলে পড়ে। ঝড়ের পর, তাদের নৌকাটি বিধ্বস্ত হয়ে যায় এবং তারা একত্রে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম শুরু করে। একদিকে শারীরিক ক্ষুধা, পিপাসা এবং ক্লান্তি, অন্যদিকে মানসিক চাপ! এই গল্পটি ভালোবাসা এবং দৃঢ়তার এক অনন্য উদাহরণ। শাইলিন উডলি এবং স্যাম ক্ল্যাফলিন প্রধান চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। বিশেষত শাইলিন উডলির আবেগ প্রবণ এবং অসাধারণ অভিনয় আপনার হৃদয় স্পর্শ করবেই। মুভিটির সিনেমাটোগ্রাফি আপনাকে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানের বিপজ্জনক পরিবেশকে বাস্তবসম্মত ভাবে অনুভব করাবে। মানুষের ভালোবাসা এবং দৃঢ়তার মাধ্যমে যেকোনো প্রতিকূলতা কে পরাজিত করা সম্ভব—মুভিটি এর একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে।
IMDb rating: 6.6/10
‘The Shallows’ (2016)
The Shallows সিনেমাটিতে প্রধান চরিত্রে ব্লেক লাইভলি দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। তার আবেগ পূর্ণ এবং বাস্তব সম্মত অভিনয় আপনাকে গল্পের গভীরে নিয়ে যাবে। গল্পটি ন্যান্সি নামের এক নারীকে কেন্দ্র করে। যে কিনা একটি নির্জন সমুদ্র সৈকতে সার্ফিং করতে গিয়ে একটি বিশাল হাঙরের আক্রমণের শিকার হয়। এরপর কোনো ভাবে একটি ছোট পাথরের উপর আটকে পড়ে, ন্যান্সি। এই পরিস্থিতিতে ন্যান্সি কিভাবে তার জীবন বাচাতে লড়াই করে এই গল্পই বলা হয়েছে সিনেমাটিতে। মুভিটির সমুদ্রের শুটিং লোকেশন এবং সাসপেন্স মুহূর্তগুলো আপনাকে বিনোদন দিতে সক্ষম। 'The Shallows' মুভিটি 2016 সালে মুক্তি পায় এবং এটি পরিচালনা করেছেন জাউমে কোলেট-সেরা।
IMDb rating: 6.3/10
'A Lonely Place to Die' (2011)
2011 সালে মুক্তি পাওয়া এই মুভিটি তৎকালীন সময়ে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এই গল্পে পাঁচজন পর্বতারোহীর একটি দুঃসাহসিক অভিযান দেখানো হয়, যেখানে তারা স্কটল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকায় হাইকিং করতে গিয়ে একটি ছোট মেয়েকে একটি গর্তে বন্দি অবস্থায় খুঁজে পায়। মেয়েটিকে উদ্ধার করার পর, তারা বুঝতে পারে যে এটি একটি বিপজ্জনক মানব পাচার চক্রের কাজ। এইটাই পরবর্তী পুরো গল্পের ভিত্তি স্থাপন করে।
মুভিটি পরিচালনা করেছেন জুলিয়ান গিলবি। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মেলিসা জর্জ এবং এড স্পিলিয়ার্স।
IMDb rating: 6.2/10
'The Hunger Games' (2012)
২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা পরিচালনা করেছেন গ্যারি রস। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জেনিফার লরেন্স, যিনি ক্যাটনিস এভারডিনের চরিত্রে তার অসাধারণ অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছেন। গল্পটি একটি ডিস্টোপিয়ান ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে ক্ষমতাধর কাপ্তান শহর প্রতি বছর তার অধীনস্থ ১২টি জেলার তরুণ-তরুণীদের মধ্যে থেকে দুজনকে বাছাই করে এক ভয়াবহ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বাধ্য করে। এই প্রতিযোগিতার নাম ‘হাঙ্গার গেমস,’ যেখানে প্রতিযোগীদের শুধুমাত্র টিকে থাকার জন্য নয়, বরং জয়ী হতে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ক্যাটনিস, যিনি তার বোনকে রক্ষা করতে স্বেচ্ছায় গেমটিতে অংশ নেন এবং নিজের সাহস ও কৌশলের মাধ্যমে সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
মুভিটির চমৎকার VFX এবং টানটান উত্তেজনা কাহিনী টিকে এক অনন্য মাত্রা এনে দিয়েছে।
এই সিনেমা আপনাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের ক্ষমতায়ন খুঁজে পাওয়ার শিক্ষা দেবে। প্রতিটি মুহূর্তই আপনাকে উজ্জীবিত করবে এবং অনুপ্রেরণা যোগাবে।
IMDb rating: 7.2/10
'Oxygen' (2021)
‘Oxygen’ মুভিটি 2021 সালে মুক্তি পায় এবং এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মেলানি লরেন্ট, যিনি তার অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে এই সায়েন্স ফিকশন থ্রিলারকে জীবন্ত করে তুলেছেন।
গল্পটি শুরু হয় একটি নারীর সঙ্গে, যিনি একটি চেম্বারের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন এবং তার স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। অক্সিজেন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, এবং তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন যে তাকে বেঁচে থাকতে হলে স্মৃতিগুলো ফিরে পেতে হবে এবং চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজতে হবে।
মুভিটির বিশেষত্ব হলো এর সীমিত সেটআপ। পুরো গল্পটি একটি ছোট চেম্বারের মধ্যে হলেও উত্তেজনা এবং রহস্য আপনাকে এক মুহূর্তের জন্যও স্থির হতে দিবে না।
IMDb rating: 6.5/10
শেষ কথা
প্রতিটি সারভাইভাল থ্রিলার মুভি আমাদের জীবনের কঠিন মুহূর্তে সাহসিকতা, দৃঢ়তা, এবং আশা ধরে রাখার গুরুত্ব শেখায়। যদি আপনি রোমাঞ্চ এবং জীবনের প্রতিকূলতায় সাহসিকতার গল্প উপভোগ করতে চান, তাহলে এই মুভিগুলো অবশ্যই আপনার দেখা উচিত।
এখনই আপনার পপকর্ন প্রস্তুত করুন এবং দারুণ এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণে হারিয়ে যান। মুভিগুলো কেমন লাগল, তা জানাতে ভুলবেন না!
Tags:
Movies